যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে।
তিনি জানান, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্য দেশগুলোর দায়িত্ব।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এতে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরা হবে। খবর এএফপি’র।
অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, শত্রুপক্ষ যুদ্ধ পুনরায় শুরু করবে না, এমন নিশ্চয়তা পেলে তেহরান যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ বৈরুত ও আশপাশের এলাকায় বুধবার ভোরে ইসরাইলি হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের অভিযানে লেবাননে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০’র বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ।
মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে। মাসব্যাপী চলা যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে ইতিবাচক কোনো সমাধানের আশায় এই ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩.২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০৩.৯৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
জাপানের নিক্কেই সূচক বুধবার লেনদেন শুরুর সময় ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ইরান ছাড়বে, সম্ভবত দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ শেষ করছি। আমরা তাদের প্রতিটি সক্ষমতা ধ্বংস করতে চাই। তবে এর আগেই কোনো সমঝোতা হতে পারে।’
ট্রাম্প পূর্বেও যুদ্ধ বা আলোচনা, দুই পথেই অবস্থান বদল করেছেন। কখনও স্থলবাহিনী পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন, আবার কখনও কূটনৈতিক সমাধানের কথাও বলেছেন।
হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ফ্রান্স, চীনসহ যারা এই পথে তেল পরিবহন করতে চায়, তাদের নিজেদেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এই প্রণালী নিয়ে আমরা কিছু করব না।’
মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে তিনি ন্যাটো মিত্রসহ অন্য দেশগুলোর সমালোচনা করে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আর তোমাদের সাহায্যে থাকবে না, যেমন তোমরা আমাদের পাশে ছিলে না। ইরান কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। কঠিন কাজ শেষ। এখন নিজেরাই তেল সংগ্রহ করো।’
পাসওভার উৎসবের প্রাক্কালে টেলিভিশনে ভাষণ দেয় নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ‘ইসরাইলি বাহিনী তেহরানের শাসন ধ্বংস করতে অভিযান চালিয়ে যাবে। আমাদের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, আমরা তা নিয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র জানায়নি, তারা ইরানের কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তেহরানও আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আল জাজিরাকে বলেন, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের কাছ থেকে তিনি এখনও আগের মতো বার্তা পাচ্ছেন। তবে এতে আলোচনা চলছে- এমনটি বোঝা যাবে না।
ইরানি বিপ্লবী গার্ড সতর্ক করেছে, আরও কোনো ইরানি নেতাকে হত্যা করলে বুধবার থেকে গুগল, মেটা ও অ্যাপলের মতো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করেন। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, ইন্টেল, টেসলা ও প্যালান্টিরসহ ১৮টি প্রতিষ্ঠান আগের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। ভবিষ্যতে এমন ঘটলে এসব প্রতিষ্ঠান ‘ধ্বংস’ করা হবে।
পেন্টাগনের প্রধান পিট হেগসেথ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর বলেন, ‘আগামী দিনগুলোই হবে সিদ্ধান্তমূলক। ইরান তা জানে, সামরিকভাবে তারা তেমন কিছুই করতে পারবে না।’
সোমবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলক্ষেত্র, প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ এবং প্রয়োজনে পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনও ধ্বংস করবে।
মঙ্গলবার ইসফাহান ও তেহরানে ব্যাপক হামলা হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যম জানায়, দেশের দু’টি ইস্পাত কারখানা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, জানজানে একটি শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির একটি কারখানাও হামলার শিকার হয়েছে। তবে এএফপি এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
তেহরানের বাসিন্দারা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ২৭ বছর বয়সী দন্তচিকিৎসক সহকারী ফাতেমেহ একটি মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে প্যারিস থেকে এএফপি’কে বলেন, ‘যখন আমি ক্যাফের টেবিলে কয়েক মিনিটের জন্য বসি, তখন মনে হয় যেন পৃথিবীটা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর আমি যখন বাড়িতে ফিরি, তখন যুদ্ধের বাস্তবতা তার সবটুকু অন্ধকার আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে আবারও আমায় গ্রাস করে।’