শনিবার নীলফামারী শহরের বড় মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমাদের এই নির্বাচনটাকে দেশ গঠনের নির্বাচন হিসেবে চিন্তা করতে হবে। দেশটাকে গড়ে তুলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখে নির্বাচন। এই নির্বাচনে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের মানুষ আবারো ভোট দেবেন। ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। কিন্তু শুধু ভোট দিলেই চলবে না। আমাদের এই নির্বাচনটাকে দেশ গঠনের নির্বাচন হিসেবে চিন্তা করতে হবে। দেশটাকে গড়ে তুলতে হবে। এই দেশ যদি আমরা গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আমরা কোথায় যাব? আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমাদের প্রথম ঠিকানা বাংলাদেশ, শেষ ঠিকানা বাংলাদেশ।’
আজ শনিবার দুপুরে নীলফামারী শহরের বড় মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এ কথা বলেন। এ সময় বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। বেকার সমস্যা দূরীকরণে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তারেক রহমান।
তিনি জানান, নীলফামারীতে ইপিজেড আছে। এ ইপিজেডকে আরো বড় করা হবে। আরো কলকারখানা গড়ে তোলা হবে। এলাকায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে; হয় তারা বিদেশে যাবেন অথবা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করবেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘আগামী দিনে রাজনীতি হবে দেশ পুনর্গঠনের রাজনীতি, রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি। আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলকে সাথে নিয়ে দেশ গঠন করতে চাই। সকলকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। মানুষকে আমরা বিবেচনা করবো তার মেধা, তার যোগ্যতা দিয়ে। তার বর্ণ দিয়ে নয়, তার ধর্ম দিয়ে নয়।’
তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বহু বছর ধরে আমরা আন্দোলন করেছি। আজ সেই অধিকার ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। এখন আমাদের মূল কাজ হলো দেশকে পুনর্গঠন করা। আমাদের টার্গেট দেশের কোটি তরুণদের তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা, সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। দেশের মানুষ, বিশেষ করে মা-বোনেরা যাতে নির্বিঘ্নে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারে, নিরাপদে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পাওে, সেই পরিবেশ আমাদেরকেই তৈরি করতে হবে।’
মানুষের ভোটাধিকারের আন্দোলন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে উপস্থিত জনসাধারণের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের ভোটের অধিকারকে ডাকাতি করে নিয়ে গিয়েছিল এক দল। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করার জন্য বিএনপিসহ বহু দলের নেতাকর্মী, বহু সাধারণ মানুষ ওই স্বৈরাচারের সময় জীবন দিয়েছে। অত্যাচার নির্যাতনে শিকার হয়েছে, মামলা-মোকাদ্দমার শিকার হয়েছে। কতগুলো নিরীহ মানুষকে রাতের অন্ধকারে মেরে ফেলা হয়েছে, এই নীলফামারী হচ্ছে তার সাক্ষী।’
এলাকার উন্নয়নের বিষয়ে গুরত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘এই এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান দরকার। এই এলাকার ইপিজেডটাকে (উত্তরা ইপিজেড) আরো বড় করতে চাই। এই এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে আরো কলকারখানা তৈরি করতে চাই। ছেলেমেয়েদের ট্রেনিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করতে চাই। যেখানে এলাকার ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং গ্রহণ করবে এবং দক্ষ শ্রমিকে তারা পরিণত হবে। এতে করে তারা নিজেরা কিছু করতে পারবে এবং বিদেশে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবে’।
ঘরে ঘরে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘১২ তারিখে ধানের শীষ জয়যুক্ত হলে আমরা এই দেশের মা-বোন এবং গৃহিণীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে চাই। আমরা প্রত্যেকটি নারীর কাছে যেই ধর্মের হোক সে যদি বাংলাদেশের একজন মা হয়ে থাকে , বাংলাদেশের একজন গৃহিণী হয়ে থাকে, আমরা তার কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেকটি খেটে খাওয়া পরিবারের মা প্রতি মাসে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পাবে।’
কৃষকদের জন্য পরিকল্পনার ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই এলাকার বহু মানুষ কৃষির সাথে জড়িত। এই কৃষকরা যদি ভালো থাকে, বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে। কৃষকরা যাতে ভালো থাকে, তারা যাতে সহজে কৃষিজাত দ্রব্য, বীজ, সার প্রয়োজন মতো পেতে পারে, সেজন্য আমরা কৃষক ভাইদের কৃষি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। যার মাধ্যমে সহজে কৃষি ঋণ পেতে পারবে। যার মাধ্যমে সে সহজে কীটনাশক ওষুধ, বীজ, সার সহজে পাবে। শুধু তাই নয়, ১২ তারিখে বিএনপি সরকার গঠন করলে সারা বাংলাদেশে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ মওকুফ করবো।’ এসময় তিনি মসজিদের ইমাম এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্মানীর ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
জনগণের ভোটে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে ইনশাল্লাহ বিএনপি সরকার গঠন করলে সরকারের অন্যতম কাজ হবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। যাতে করে এই এলাকা আবার সবুজ শস্য-শ্যামলা হয়ে উঠতে পারে, খাল-বিল যাতে পানিতে ভরে যায়। এলাকার মানুষের যেন পানির কষ্ট না হয়। সেজন্য বিএনপি সরকার গঠনের সাথে সাথে দ্রুততার সাথে আমরা তিস্তা মহা পরিকল্পনার কাজ শুরু করতে চাই।’
এসময় তিনি নীলফামারী মেডিক্যাল কলেজের উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নয়ন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা জানান।
নির্বাচনে একটি দল বিভ্রান্তি ছড়াছে উল্লেখ কওে তারেক রহমান বলেন, ‘একটি দলকে আমরা খেয়াল করছি সমাজের বিভিন্ন মানুষকে তারা ভয় দেখাচ্ছে, বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে তারা। আমি তাদের উদ্দেশ্যে পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই— বাংলাদেশের কোনো ভোটারকে যারা ভয় দেখাবে, যারা তাদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, কারো সাথে অন্যায় হলে আমরা সেই অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
দেশের মালিক জনগণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ গঠনের যে পরিকল্পনার কথা আপনাদের সামনে বললাম, সেগুলো তখনই বাস্তবায়ন সম্ভব, যখন এই মাঠ ভরা লোক, এই শহর ভরা লোক, এই সমগ্র জেলার মানুষ আমাদেরকে সমর্থন দেবে। আমি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইতে এসেছি। আপনারা যদি ধানের শীষকে জয়যুক্ত করে সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তাহলে যে পরিকল্পনার কথা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি, সেই পরিকল্পনা আমরা ইনশাল্লাহ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবো।
প্রতিপক্ষের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আজকে এখানে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অনেক কথাই বলতে পারতাম। কিন্তু, ওইসব কথা বলে কি জনগণের উপকার হতো? মানুষ জানতে চায় যে, কোন রাজনৈতিক দল তাদের জন্য কী করবে। দেশ গঠনে কী কাজ করবে, মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তনের জন্য কী কাজ করবে? আজ বিএনপি একমাত্র দল, যারা পরিষ্কারভাবে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে যে, বিএনপি মা-বোন, কৃষক, তরুণ, যুবকদের জন্য কী করবে। ভবিষ্যৎ শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা, দেশের মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে কী করবে, সকল পরিকল্পনা বিএনপি জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘তিস্তা মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় আপনাদের সঙ্গে নিয়ে খাল খননের কাজ শুরু করতে চাই। আসুন আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি— যাতে আল্লাহ আমাদেরকে যে সকল পরিকল্পনা আমরা এলাকার জন্য, দেশের জন্য, মানুষের জন্য গ্রহণ করেছি, সে সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি যেন আমাদেরকে সুযোগ দেন।’
সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মীর সেলিম ফারুক। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ এইচ এম সাইফুল্লাহ রুবেলের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মো. মিজানুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলাম, নীলফামারী-২ (সদর) আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী, নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী সৈয়দ আলী, নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আব্দুল গফুর সরকার, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সোহেল পারভেজ, মোস্তফা হক প্রধান, রিয়াজুল ইসলাম, সদস্য আবু মোহাম্মদ সোয়েম, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলমগীর সরকার প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম, ভগিনীপতি মো. রফিকুল ইসলাম। পরে নীলফামারীর চারটি আসনে বিএনপির তিন প্রার্থী ও শরিক দলের এক প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান।
এর আগে তারেক রহমান দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে হেলিকপ্টারে করে শহরের বড় মাঠ মিনি স্টেডিয়ামে নামেন। দুপুর ২টার দিকে তিনি জনসভাস্থলে আসেন। এ সময় সড়কের দুই পাশে বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাকে স্বাগত জানান। দুপুর ২টা ৭ মিনিটে তারেক রহমান বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। ২১ মিনিট বক্তব্য রাখেন তিনি। এরপর দুপুর ২টা ৪০ মিনিট তিনি হেলিকপ্টারে করে দিনাজপুর জেলার বিরামপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।